info@tejgaonsanatan.org
+880 1XXXXXXXXX
২০১৭ সাল থেকে এই সংগঠনের অগ্রযাত্রার শুভ সূচনা হয়। ‘তেজগাঁও সনাতন সমাজ উন্নয়ন পরিষদ’ দেশে ও বিদেশে সনাতন ধর্মের আদর্শ ছড়িয়ে দিতে এবং একটি সুশৃঙ্খল সমাজ গঠনে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো আধ্যাত্মিক চেতনা জাগ্রত করা এবং মানবিক সেবার মাধ্যমে সমাজের উন্নয়ন সাধন করা।
মন্দির প্রতিষ্ঠার পূর্বকথা
ঢাকা মহানগরীর তেজগাঁও থানার ২৬নং ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত এলাকাসমূহে বিপুল সংখ্যক হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বসবাস। সকলের মধ্যে পারস্পরিক সুসম্পর্ক রক্ষা, যথার্থ ধর্মজ্ঞান ও হিন্দুধর্মীয় রীতি-নীতির মাধ্যমে সকল পূজা-পার্বনে সম্মিলিত হয়ে উৎসব উদযাপন আকাঙ্খা থেকে একটি মন্দির স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া। যেকোনো ভালো কাজের সূত্রপাত হয় বিশেষ কিছু উদ্যোগী ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত শ্রমী-মানুষের মাধ্যমে। এলাকার আড্ডাপ্রিয় কিছু লোক সুখে-অসুখে জড়ো হত শচীনদার মেডিসিন কর্নারে। বিভিন্ন সময়ে নানা আলাপে সংলাপে শচীনদা একটি সমবায় সমিতি তৈরির কথা বলতেন।
মেডিসিন কর্নার এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলো। নগর ধানসিঁড়ি এপার্টমেন্ট, খেলাঘর মাঠ, মসজিদ মার্কেট-এর চৌরাস্তায় মেডিসিন কর্নারের অবস্থান হলেও শচীনদার সঙ্গে স্থানীয় লোকজনের নিবিড় যোগাযোগ হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে অভূতপূর্ব যোগসূত্র স্থাপন করেছিল। হিন্দু কল্যাণ সমবায় সমিতি গঠনের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হল শচীন চন্দ্র বর্মণকে সভাপতি ও সুখলাল নন্দীকে সাধারণ সম্পাদক করে। প্রাথমিক দশজনের ছোট্ট দল অল্প সময়ে ত্রিশের কোটায় পৌঁছে গেল।
সময়টা তখন জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি ২০১৬। অল্প কিছুদিন পর সরস্বতী পূজার উৎসব। বেশিরভাগ লোকজন ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার সুযোগসুবিধার কারণে ফার্মগেইট তেজকুনিপাড়া সংলগ্ন এলাকাটা বিশেষ পছন্দ করে। চেনাজানার ছোট্ট পরিসরকে সরস্বতী পূজা উপলক্ষ্যে একটি স্থানীয় হিন্দু সম্মেলনের রূপ দেওয়ার জন্য হিন্দু কল্যাণ সমবায় সমিতির সভাপতি এবং সম্পাদক তাঁদের প্রাথমিক দশজনের সদস্য নিয়ে পরিকল্পনা করতে থাকে। মেডিসিন কর্নারে প্রায়দিন সরস্বতী পূজার কথাবার্তা চলতে থাকে। কিন্তু ক্রেতা ও স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতিতে যুৎসই আলোচনা সম্ভব হচ্ছিল না। তারপর তেজতুরি বাজারে রণধীরদার টেইলারিং শপে সবাই কয়েকদিন বসলেন। পরবর্তীকালে সরস্বতী পূজার আয়োজনের আলোচনা স্থানান্তরিত হলো অরুণ চন্দ্র ভৌমিকের কাওরান বাজারের ম্যাক ট্রেভেলস-এর অফিসে। ইতিমধ্যে চারজনের নাম জানা হয়ে গেলেও অন্যতম সারথীরা ছিলেন মৃত্যুঞ্জয় রায়, সংগীত কুমার ঘোষ, শ্যামল মিত্র, হীরালাল বাইন, নেপাল চন্দ্র, প্রিয়লাল শর্মা, দীপক কর্মকার, প্রমোদ রঞ্জন রায়, সঞ্জীব মৈত্র, ভবেষ গোস্বামী, প্রবীর সরকার প্রমুখ।
সুষ্ঠুভাবে সরস্বতী পূজা উদ্যাপনের সার্বিক দায়িত্ব দেওয়া হয় অরুণবাবুকে। পূজার জন্য প্রাথমিক বাজেট ছিল ত্রিশ হাজার টাকা কিন্তু পূজা সম্পন্ন হয়েছিল প্রায় লক্ষাধিক টাকায়। ভালো এবং মহৎ কাজে অর্থের চেয়েও প্রধান শক্তি একাগ্রতা ও ভালোবাসা তা আবারও প্রমাণিত হল। ত্রিশ-পঁয়ত্রিশটা মানুষের পূজার অর্থ সংগ্রহ অপেক্ষা পরিচয় এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্পর্ক সম্প্রসারণের মাধ্যমে বিস্তৃতি স্বপ্নজাল তৈরি করা। বিরাট সফলতা নিয়ে বটমলী হোমস টেকনিক্যাল স্কুলের মাঠে উদ্যাপিত হলো সরস্বতী পূজা। প্রস্ফুটিত হতে শুরু করেছিল তেজকুনিপাড়ার এ স্থায়ী মন্দিরের ভ্রূণ বা ভিত্তি। দিনব্যাপী নানা আয়োজন ও স্বল্প সময়ের মধ্যে অল্পসংখ্যক উদ্যোমী মানুষ চমৎকার ও সুশৃঙ্খলভাবে এ পূজার আয়োজন সম্পন্ন করে।
সন্ধ্যায় ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আয়োজকদের ছেলেমেয়েসহ আমন্ত্রিত বেশকিছু শিল্পীর পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা বেশ জমে উঠেছিল। এর মধ্যে পূজা মণ্ডপে ২৬ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার শামীম হাসান ও মহিলা কমিশনার শামীমা রহমান ও স্থানীয় বেশ কিছু স্বজ্জন মণ্ডপে আসেন। পালটে যেতে থাকে অনুষ্ঠানের ছন্দ ও মাত্রা। যেহেতু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এ বিদ্যাদেবীর পূজা সকল শিক্ষার্থীর পূর্ব পরিচিত তাই অন্য ধর্মের মানুষ হয়েও এ উৎসবে একাত্ম হতে উনাদের তেমন সময় লাগেনি। অনুষ্ঠানস্থলে বসে শামীমা রহমান নিজে লিখে--সুর করে মঞ্চ মাতিয়ে তুলেন গান গেয়ে। শুভেচ্ছা বক্তব্য দিতে মঞ্চে ওঠেন শামীম হাসান। ঢাকা শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে নানা ধরনের পূজা হয়ে থাকলেও উনার বাড়ির কাছে, উনার ওয়ার্ডে পূজা উদ্যাপনে তিনি যারপরনাই খুশি হলেন।
উদ্যোগক্তাদের মনের ভেতর পুষে রাখ স্বপ্নটা তিনি আরও আন্দোলিত করে দেন। এ মঞ্চে তিনি ২০১৭ সালের তেজকুনিপাড়ায় দুর্গপূজা এবং এ এলাকায় একটি মন্দির স্থাপনের সার্বিক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন।
পরবর্তীকালে শামীম হাসানের মুখে শুনেছিলাম বেশ অনেক বছর আগে জনৈক কানাই বাবু উনাকে এ এলাকায় মন্দির স্থাপনের অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু সে সময় তাঁর কাছে এটা ছিল নিতান্তই কথার কথা। পরবর্তী সময়ে সম্মিলিত হিন্দু জনগোষ্ঠীর সৎ-ইচ্ছা সংক্রমিত হল এলাকার হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানসহ আপামর জনগণের মাঝে। সরস্বতী পূজার সামগ্রিক অর্জন স্থানীয় হিন্দু জনগোষ্ঠীকে নতুনভাবে ঐক্যবদ্ধ করলো। ডানা মেলতে লাগলো নতুন স্বপ্নের।
ব্যাংকগলির আনোয়ার গার্ডেন-এ প্রদীপ কুমার সাহা সরস্বতী পূজাউত্তর একটি পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের আয়োজনকরলেন। আপ্যায়ন-শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর শুরু হলো উপস্থিত সুধীজনের পরিচয় পর্ব। বাড়ির কাছে আরশীনগরের পড়শী বন্ধুর সঙ্গে। অর্জিত সফলতাকে পুজি করে শুরু হতে থাকে ২০১৭ সালের দুর্গাপূজাআয়োজনের। বেশ কয়েকবার প্রদীপদার বাসায় মিলিত হওয়ার পর উল্লেখযোগ্যভাবে সদস্য-সদস্যা সংগৃহীতহতে থাকে, বাড়তে থাকে তেজগাঁও সনাতন সমাজ উন্নয়ন পরিষদ। উনার বাসায়ই দুর্গাপূজা ২০১৭ উদ্যাপনএবং স্বপ্নের মন্দির স্থাপনে একদল স্বপ্নবাজ মানুষ ক্রমশ সম্প্রসারিত হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে পূজা উপলক্ষ্যে নানা আলোচনার জন্য এডভোকেট বিনয়দার লায়ন্স মার্কেটের অফিস উন্মুক্ত হয়ে যায়। ২০১৭ সালের দুর্গাপূজা আয়োজনের মহাযজ্ঞ শুরু হয়ে যায়। প্রতিমা নির্মাণ, ঠাকুর নির্বাচন এবং স্মরণিকা অপরাজিতা প্রকাশের জোড় প্রস্তুতি চলে। কিন্তু সবকিছু ভালোমতো এগুলোও পূজার স্থান নিয়ে শুরু হলো নতুন জটিলতা। প্রথমে তেজগাঁও বিজ্ঞান কলেজ প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হলেও নানা অসুবিধার কারণে তা বাতিল হয়ে যায়। পূজার সময় ঘনিয়ে আসছে। স্থানীয় ওয়ার্ড কমিশনার, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, এলাকাবাসী, পূজার সংগঠক এমনকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সকলেই পূজার স্থান ও নিরাপত্তা নিয়ে ভীষণ চিন্তায় পড়ে যান। ঢাকা উত্তর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জনাব জিল্লুর রহমান সংযুক্ত হয়ে পড়েন পূজা উদ্যাপনের সঙ্গে। বিজয় স্বরণি ফ্লাইওভারের নিচে অথবা রাসেল ক্রীড়াচক্রের মাঠে প্রথম দুর্গাপূজা অনুষ্ঠানের জন্য আলোচনা চলতে থাকে। জনাব জিল্লুর রহমান এবং জনাব শামীম হাসান এক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা রেখেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব আসাদুজ্জামান খান কামাল-এর নিবিড় তত্ত্বাবধানে এবং দিক্ নির্দেশনায় অবশেষে তেজকুনিপাড়া মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে প্রথম দুর্গপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এলাকার হিন্দু-মুসলমান-খ্রিস্টান সকলেই এলাকায় প্রথম দুর্গাপূজাকে স্বাগত জানাল এবং উৎসবে সঙ্গী হলেন। প্রথম বছরের দুর্গা পূজায় রক্তদান, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, আরতি প্রতিযোগিতা এবং প্রতিদিন সন্ধায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হত। উক্ত অনুষ্ঠানে মন্ত্রীমহোদয়, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, উচ্চ পর্যায়েরর সরকারি কর্মকর্তাসহ নানা স্বজন ব্যক্তির উপস্থিতি পুরো অনুষ্ঠানের গুণমান বাড়িয়ে দিয়েছিল। সবকিছু ছাপিয়ে প্রতিদিন প্রতিক্ষণ স্থায়ী একটি মন্দিরের আহ্বান, প্রতিশ্রুতি ভাসতে লাগলো। এস্থানে পরবর্তী সময়ে সরস্বতী পূজা, কালীপূজা হয়েছিল।
দুই হাজার আঠার খ্রিস্টাব্দ তেজগাঁও সনাতন সমাজ উন্নয়ন পরিষদের জন্য উল্লেখযোগ্য ও স্মরণীয়। স্বপ্নবাজ কর্মীবাহিনির ডানায় ভর করলো বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত এক ঝাঁক উপদেষ্টা মণ্ডলী। নিরন্তর সহযোগিতা, পরামর্শ ও দিক্ নির্দেশনা পেল কমিটি। দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে স্বপ্ন মন্দিরের আলোকছটা দেখা দিতে লাগলো। সভাপতি প্রদীপ কুমার সাহা, সম্পাদক সুখলাল নন্দী আর এক জোট সহযাত্রী নিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, নানা দপ্তর ঘুরে ঘুরে মন্দিরের জন্য একটুকরা জমির বন্দোবস্ত করলেন। ঈশ্বরের অপার কৃপায় মেট্রোরেল এবং এলিভেটর এক্সপ্রেস নির্মাণের প্রাক প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল। ফলে এস্থানে রেলওয়ে বস্তি উচ্ছেদ হয়ে গেল। বারবার মিটিং সিটিং দিয়ে অবশেষে স্কুলের পিছনে তিন রাস্তার মোড়ে কর্নার প্লটটা নির্বাচন করা হলো। শুরু হয়ে গেল নতুন এক তীর্থক্ষেত্র। দলীয়ভাবে এককভাবে নানা সময় সদস্য/সদস্যবৃন্দ এ জায়গায় জমা হতো। দুর্গাপূজার জন্য অস্থায়ী প্যান্ডেল নির্মাণের পরিকল্পনা করা হল। রাতারাতি খোকন শর্মার অপূর্ব দক্ষতায় বর্তমান মন্দিরের ভিত্তি ও প্রাঙ্গন নতুন রূপ পেয়ে গেল। নির্মিত হলো পূজার অস্থায়ী প্যান্ডেল। পূজা শেষে দুর্গা মা জলে বিসর্জন নিলেন না। আশ্রয় দিলেন ভক্তবৃন্দকে মন্দিরের কৃপার ছায়াতলে।
তেজগাঁও সনাতন সমাজ উন্নয়ন পরিষদ ভালোবাসার এক অপূর্ব বন্ধনে গড়ে তুললেন পরস্পরের মধ্যে। সাংগঠনিক পদ ছাপিয়ে ভালোবাসার ভালোলাগার নতুন সেতু বন্ধন রচিত হলো। এরি মধ্যে প্রথমে টিন এবং পরবর্তীকালে আধাপাকা মন্দির তৈরি হলো। নিয়মিত মায়ের পূজা চলতে লাগলো। পাশাপাশি বারো মাসের তেরো পূজা তো আছেই। সন্ধ্যায় আরতি এবং গীতাপাঠ। তেজকুনিপাড়ার অখ্যাত তেমাত্রার বর্জ্যময় স্থানটি পবিত্র মন্দিরের মোড়ে রূপান্তরিত হতে লাগলো এলিভেটর এক্সপ্রেস ওয়ের একটি পিলার মন্দিরের কোন্ জায়গায় পড়বে তা নিয়ে শঙ্কার শেষ নেই। রেলওয়ের এ জায়গা মন্দিরের জন্য স্থায়ীভাবে বরাদ্ধ নেওয়ার জন্য বর্তমান কমিটির চেষ্টার কোন ঘাটতি নেই।
২০১৯ দুর্গাপূজার আয়োজন পুরোদমে শুরু হয়ে গেল। ঈশ্বরের ইচ্ছা আর ভক্তবৃন্দের স্বপ্ন অচিরে বাস্তবতার লীলাভূমিতে পরিণত হলে এ বছরও অস্থায়ী তবে শক্ত ভিত্তির উপর দুর্গাপূজা উদযাপনের সিদ্ধান্ত হল। উন্মুক্ত পাশের জায়গায় ধর্মসভা, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য বরাবরের মত ব্যবহৃত হবে। স্বপ্নবাজ একদল মানুষ এভাবে তৈরি করল নতুন এক তীর্থভূমি।
আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নির্ভীকভাবে এই স্থানে বৃহত্তর পরিসরে একটি নান্দনিক মন্দির স্থাপন করবে। যেখানে দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তবৃন্দ সমবেত হয়ে এই মন্দিরকে একটি তীর্থভূমিতে পরিণত করবে।
© Tejgaon Sanatan Samaj Unnayan Parishad. All Rights Reserved 2026.